প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা কি সন্তানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ?
গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত একজন নারীকে আট থেকে নয় মাস বা তারও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং নানা কষ্ট সহ্য করতে হয়। এইসব পরিবর্তন ও কষ্টের অনুভূতিগুলোর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফলশ্রুতিতে প্রসবের দু’-তিনদিন পর থেকেই অনেক মায়ের মুডসুইং হয়। নতুন মায়ের মেজাজ পরিবর্তন, কান্না কান্না ভাব, উদ্বেগ, রাতে ভালো ঘুম না হওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। এই অবস্থাকে প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বলা হয়।
এটি মূলত মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের একটি ধরন যা প্রসবের সাথে সম্পৃক্ত। প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ নারী এই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এটি প্রসবোত্তর প্রথম সপ্তাহে শুরু হয়ে কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রথম দুই সপ্তাহে এই লক্ষণগুলোকে পোস্টপার্টাম ব্লুজ বা বেবি ব্লুজ বলা হয়।
সাধারণত সন্তান জন্মদানের ২-৩ সপ্তাহ পরই বেবি ব্লুজ কেটে যেতে শুরু করে। কিন্তু কোন কারণে যদি এটা না হয়, তাহলে প্রসব মা পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগছে বলে মনে করা হয়। তখন অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে মায়ের দুধের গুরুত্ব অপরিসীমশিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে মায়ের দুধের গুরুত্ব অপরিসীম
ঝুঁকির কারণ
- প্রসবের আগে বিষণ্নতা।
- মানসিক বিষন্নতাজনিত অসুস্থতা।
- পরিবারে মানসিক বিষণ্নতার ইতিহাস।
- মানসিক চাপ।
- শিশু জন্মের সময় জটিলতা।
- সহায়তা-সহমর্মিতার অভাব।
- ঔষধ ব্যবহার জনিত ব্যাধি, ইত্যাদি।
রোগের সূত্রপাত : যদিও এর নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, তবে শিশু জন্মের পর এক সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যে শুরু হয়।
লক্ষণ
- অসহায়ত্ব এবং আশাহীনতার অনুভূতি।
- নেতিবাচক চিন্তাচেতনা।
- দৈনন্দিন কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
- চরম বিষণ্নতা বোধ।
- অকারণে কান্নাকাটি করা।
- ভালো লাগার জিনিসগুলো ভালো না লাগা।
- সবকিছুতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলা।
- রুচি বা খাওয়ার পরিবর্তন।
- ঘুমের পরিবর্তন।
- অল্পতেই রাগ বা বিরক্তিবোধ করা।
- নিজের প্রতি ঘৃণা বা রাগের অনুভূতি।
- নিজেকে দোষারোপ করা, বারবার জাস্টিফাই করা।
- বেপরোয়া আচরণ।
- অকারণ দাম্পত্যকলহ।
- আত্মহত্যার চিন্তা করা।
গর্ভাবস্থায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে যা করবেনগর্ভাবস্থায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে যা করবেন
প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন স্বাভাবিক মা ও শিশুর বন্ধনে প্রভাব ফেলে এবং শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠায় স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতার ফলে সন্তানের পরিচর্যার ক্ষেত্রে মা সঙ্গতি হারিয়ে ফেলেন, এতে সন্তানের পরিপূর্ণ যত্নে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে বাবারাও পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হতে পারে।
চিকিৎসা
সাধারণত উপসর্গের ধরণ বুঝে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের চিকিৎসা করা হয়। এ সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক সাপোর্ট। পরিবারের সদস্যদের মায়ের পাশে থাকা খুব জরুরি। এছাড়া অ্যাঞ্জিওলাইটিক বা অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ওষুধ ও সাইকোথেরাপির মাধ্যমেও এর চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসকের সহায়তা নিয়ে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়া অবস্থাতেও এইসব ওষুধ সেবন করা যায়। এই বিষণ্নতায় মায়ের মানসিক পরিবর্তনের সাথে সামাজিক পরিবর্তনসমূহ সম্পর্কিত। ওষুধ এবং কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে চিকিৎসা করে এর নিরাময় সম্ভব।
No comments